ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ

ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ সম্পর্কে বিস্তারিত সকল তথ্য জেনে নিন!

ঢাকা শহরে গার্লস কলেজ হিসেবে ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের জনপ্রিয়তা দেখার মতো। শিক্ষার মান, প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, নিয়ম-নীতিসহ সবকিছুর সমন্বয়ে যেনো একেবারে স্মুথলি চলে যাচ্ছে কলেজটির শিক্ষা কার্যক্রম। বছরের পর বছর ধরে ভালো রেজাল্ট করে আসা এই কলেজটিকে নিয়ে বর্তমানে অনেক আলোচনা কিংবা সমালোচনাও হতে দেখা যায়।

সবমিলিয়ে একটি পরিচিত গার্লস কলেজ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্যই অনেকে জানতে চায়। সে কথা বিবেচনা করে আজ আমাদের এই আর্টিকেলটিকে সাজানো হয়েছে ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য দ্বারা। কলেজটি সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য একের পর জেনে নিতে আমাদের সাথেই থাকুন। 

ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ পরিচিতি

শুরুতেই হয়তো বুঝে গেছেন এটি একটি উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ মূলত বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার একটি গার্লস কলেজ। মেয়েদের স্বনামধন্য এই কলেজটির নামকরণ করা হয়েছিলো ভিকার উন নিসা নূন এর নামে। এই ভিকার উন নিসা নূন ছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশের গভর্নর ফিরোজ খান নূনের স্ত্রী। 

বলে রাখা ভালো ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ কিন্তু একটি বেসরকারি কলেজ। যথেষ্ট জনপ্রিয়তা থাকায় কলেজটিকে অনেকেই সরকারি কলেজ ভেবে ভুল করে থাকেন। ব্যাপারটা আসলে তেমন নয়। মূলত শিক্ষার মান ভালো হবার কারণেই ঢাকার অনেকেই কলেজটিতে তার প্রিয় সন্তানকে ভর্তি করিয়ে দিতে চান। 

ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ পদে নিয়োজিত রয়েছেন কামরুন নাহার। ও হ্যাঁ! কলেজটিতে শিক্ষার অন্যতম মাধ্যম ভাষার ক্ষেত্রে একইসাথে ইংরেজি এবং বাংলা দুটো ভাষাকেই ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এছাড়াও কলেজটি সম্পর্কিত বিভিন্ন পুস্তকসহ সংশ্লিষ্ট কারণে এর নিজস্ব একটি প্রকাশনা কোম্পানিও রয়েছে। যেটির নাম রাখা হয়েছে “নূন প্রবাহ”। কলেজটিতে শিক্ষার্থীদের ড্রেসের কালার কোড হিসেবে ব্যবহার করা হয় আকাশী ও সাদা রঙকে। 

বর্তমানে ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ নামের এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে সর্বমোট ২৪,০০০ শিক্ষার্থী অধ্যায়নরত অবস্থায় রয়েছে। প্রয়োজনীয় কারণে কলেজটির অফিসিয়াল ওয়েবসাইটও ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে। ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের ঠিকানা হলো vnsc ডট কম। 

ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ এর অবস্থান

ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজে যেহেতু শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি সেহেতু কলেজটিতে কয়েকটি শাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যার ফলে ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজসহ এর শাখাগুলির অবস্থান সম্পর্কেও জেনে নেওয়া উচিত। বর্তমানে কলেজটির অবস্থান বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রস্থলে। কলেজটিতে যেতে হলে আপনাকে রমনা থানাধীন ১/এ নিউ বেইলী রোডে চলে যেতে হবে।

যারা ঢাকার গুলিস্তানের জিরো পয়েন্ট থেকে বা ঢাকার গুলিস্তানের জিরো পয়েন্ট হয়ে ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজে যেতে চান তাদের আনুমানিক এক কিলোমিটার এবং ঢাকা জিয়া বিমান বন্দর থেকে আনুমানিক দশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে। বলে রাখা ভালো, ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের ৩ টি শাখা বসুন্ধরা, আজিমপুর এবং ধানমন্ডিতে অবস্থিত। 

ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ এর ইতিহাস 

এবার চলুন ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের ইতিহাস সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক। মূলত ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ নামক এই প্রতিষ্ঠানটি ১৯৫২ সালের দিকে প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠানটিতে কেবলমাত্র মেয়েদেরই পড়ার সুযোগ করে দেওয়া হয় এবং এই ধারাবাহিকতা এখনো পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে। 

কলেজটি সে-সময় যার নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো তিনি মূলত বাংলাদেশের কোনো নাগরিক ছিলেন না। ভিকারুননিসা নুন একজন অস্ট্রেলিয়ান নারী ছিলেন। তবে ১৯৪৫ সালে ফিরোজ খান নুনের সাথে বিবাহে আবদ্ধ হওয়ায় তিনি বাংলাদেশের একজন নাগরিক হয়ে উঠেন এবং ইসলাম ধর্মও গ্রহণ করে নেন৷ 

ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার বেশ আগে থেকেই এই নুন পরিবারটি সামাজিকভাবে বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। বিশেষ করে সমাজের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে হাতে দেওয়ায় সে-সময় এই নুন পরিবারকে মোটামুটি সকলেই চিনতো। 

কলেজটি প্রতিষ্ঠা করার পরপরই এই নুন পরিবার শিক্ষা বিস্তার ও প্রসারের অবদান হিসেবে একটি তহবিল গঠনেরও উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এই তহবিলের মাধ্যমে তৎকালীন পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানি শিক্ষার্থীদের যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষালাভের সুযোগ করে দেওয়া হতো। বিশেষ করে যারা অর্থের অভাবে বাইরের দেশে পড়তে যেতে পারতো না তাদের অর্থ দিয়ে সাহায্য করতো এই তহবিলটি। 

শুরুতে এই ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষাব্যবস্থায় কেবলমাত্র ইংরেজি ভাষাকেই ব্যবহার করা হলেও স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা ভাষাকেও যুক্ত করা হয়। একটা সময়ে এসে ১৯৮৬ সালের দিকে কলেজটিতে আরো একটি বৈকালিক শাখা খোলার ব্যবস্থা করা হয়। যদিও এর পেছনে কারণ হিসেবে বাড়তি শিক্ষার্থীদের চাপ কাজ করেছিলো।

ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ এর স্থাপনা 

স্থাপনার দিক দিয়েও যথেষ্ট সমৃদ্ধ এই ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ। কলেজটিতে ৩ তলাবিশিষ্ট ২ টি আলাদা আলাদা ভবন রয়েছে। পাশাপাশি যেহেতু কলেজটিতে দিনকে দিন ছাত্রীর সংখ্যা বেড়ে চলেছে সেহেতু আরো একটি ৮ তলাবিশিষ্ট ভবনের নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। 

ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজে ছাত্রীদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে ক্যান্টিন এবং কমনরুমেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। সাথে রয়েছে খেলাধুলা কিংবা ফ্রি টাইম কাটানোর জন্য একটি বিশাল মাঠ। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রোগ্রাম করতে দিয়ে যেনো কোনোধরণের জায়গা সংকটে পড়তে না হয় সে কথা বিবেচনা করে তৈরি করে হয়েছে একটি অডিটোরিয়াম। 

কার্যত ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের মুসলিম শিক্ষার্থীরা যেনো যোহর কিংবা আসরের নামাজটুকু যথাসময়ে পড়তে পারে তার ব্যবস্থা হিসেবে কলেজটিতে নামাজের ২ টি কক্ষের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়াও অন্যান্য কলেজের মতো প্রয়োজনীয় বই দ্বারা সাজানো একটি লাইব্রেরীও রয়েছে৷ সেই সাথে কলেজটির মাঠের একপাশে শোভা পাচ্ছে একটি শহীদ মিনার। 

ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ এর শিক্ষা কার্যক্রম

শিক্ষা কার্যক্রম হিসেবে ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজর বাংলাদেশের চলমান শিক্ষা কার্যক্রমই পরিচালনা করে আসছে। তবে কলেজটিতে শিক্ষার্থী বেশি থাকায় সর্বমোট ৪ টি আলাদা আলাদা শাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। 

ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ এর কমন রুলস

প্রতিটি কলেজেরই আলাদা কিছু রুলস রয়েছে। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে এসব রুলস পালন করা প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রীরই দায়িত্ব। বেশ পরিচিত এবং প্রতি বছর ভালো পারফরম্যান্স করায় ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের কমন রুলসগুলিকে বেশ কড়াভাবেই নেওয়া হয়ে থাকে। চলুন তবে জেনে নেওয়া যাক সেই রুলসগুলি কি কি হতে পারে সে-সম্পর্কে: 

  • কলেজটিতে ভর্তি হতে হলে প্রতিটি ভর্তিচ্ছুকে অনলাইনে আবেদন করতে হবে
  • নিয়ম মেনে কলেজ ড্রেস পড়ে তবেই কলেজে প্রবেশ করতে হবে
  • ল্যাবে গেলে এপ্রোন ব্যবহার করতে হবে
  • কলেজ ড্রেসের জুতা হিসেবে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে নীল রং এর স্যু পড়তে হবে
  • নিয়মিত কলেজ ফি পরিশোধ করতে হবে
  • রেজাল্ট খারাপ হলে গার্ডিয়ান নিয়ে গিয়ে তার কৈফিয়ত দিতে হবে

ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ এর পরিবেশ 

পরিবেশের দিক দিয়ে ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজকে অভিযোগ করার মতো কিছুই নেই। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে কলেজটি পরিবেশের দিক দিয়ে বেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। 

কলেজটির সামনে থাকা একটি বিশাল মাঠ শিক্ষার্থীদের সবুজ ঘাসে বসে সময় কাটাতে সাহায্য করে। বিভিন্ন শিক্ষণীয় বই দ্বারা সাজানো লাইব্রেরি শিক্ষার্থীদের মানসিক রিফ্রেশম্যান্ট তৈরিতে সাহায্য করে৷ সেই কলেজে থাকা ক্যান্টিন শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যকর খাবারের দিকটা নিশ্চিত করছে। সবমিলিয়ে পরিবেশ নিয়ে কলেজটির শিক্ষার্থীদের কোনোধরণের হা-হুতাশ নেই বললেই চলে! 

ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজে ভর্তি যোগ্যতা

এক্ষেত্রে যারা ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ থেকে বিজ্ঞান শাখার ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে ইংরেজি ভার্সনে পড়তে চাইবে তাদের সকলকে জিপিএ ৫ প্রাপ্ত হতে হবে। বিজ্ঞান শাখার এই ইংরেজি ভার্সনে সিটের পরিমাণ যথেষ্ট কম থাকায় প্রতিবছরই হাড় হীম করা প্রতিযোগিতা হয়ে থাকে। 

পাশাপাশি যারা এই কলেজ থেকে বাংলা মাধ্যমে বিজ্ঞান শাখায় পড়তে চাইবে তাদেরকেও এসএসসিতে জিপিএ ৫ পেতে হবে। যদিও এই অংশে সিটের সংখ্যা রয়েছে মোট ১২৮০ টি। এছাড়াও বাংলা মাধ্যমের ব্যবসা শাখায় কলেজটির ভর্তি যোগ্যতা হিসেবে এসএসসিতে জিপিএ ৪.৫ পাওয়াকে ধরে নেওয়া। এই সেক্টরে সিটের সংখ্যার সর্বমোট ৩০০ টি। 

এবার আসি উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের মানবিক শাখায়। ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের বর্তমানে মানবিক শাখার কার্যক্রম চলছে কেবলমাত্র বাংলা মাধ্যমে। এক্ষেত্রে আবেদনকারীকে এসএসসিতে জিপিএ ৩.০০ পেয়ে উত্তীর্ণ হতে হবে এবং এই শাখায় কলেজটিতে সিটের পরিমাণ রয়েছে সর্বমোট ৩০০ টির মতো। 

ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজে পড়াশোনার খরচ

আর্টিকেলের এই অংশটি তাদের জন্য যারা নিজ সন্তানকে ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজে পড়াতে চান। বর্তমানের রুলস অনুযায়ী ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজে পড়াশোনা করার খরচ হলো মাসিক ১২০০ টাকার মতো। পাশাপাশি ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রেও কলেজটি আলাদা ফি চার্জ করে থাকে। এক্ষেত্রে ভর্তিচ্ছুকে এককালীন ১০,০০০ টাকা পরিশোধ করতে হবে। প্রতি পরীক্ষার ফি হিসেবে কলেজটি এক একজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ১,৫০০ টাকা চার্জ করে থাকে এবং সেশন ফি হিসেবে চার্জ করে মোট ৩,০০০ টাকা। 

ইতি কথা

অবিভাবক কিংবা শিক্ষার্থী যেকেউই নিশ্চিন্তে ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের উপর নির্ভর করতে পারেন। কারণ বাংলাদেশের শিক্ষা কার্যক্রম অনুসারে অন্যান্য গার্লস কলেজের চাইতে বেশ এগিয়ে রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটি। আজ এতোটুকুই! পরবর্তীতে অন্য কোনো কলেজের রিভিউ নিয়ে আবার হাজির হবো। 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *