ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তথ্য

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর যাবতীয় সকল তথ্য!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকার শাহবাগে অবস্থিত একটি স্বায়ত্ত্বশাসিত গবেষণাধর্মী সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। এটি 1921 সালে স্থাপিত হয়। সূচনালগ্ন থেকে বিভিন্ন প্রথিতযশা বৃত্তিধারী ও বিজ্ঞানীদের মাধ্যমে কঠোরভাবে মান নিয়ন্ত্রিত হওয়ার কারণে একে প্রাচ্যের অক্সফোর্ডও বলা হয়। প্রাথমিকভাবে 3টি অনুষদ, 12টি বিভাগ, 60 জন শিক্ষক এবং 877 জন ছাত্র নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু করে। 

এখানে বর্তমানে 13টি অনুষদ, 83টি বিভাগ, 12টি ইনিস্টিটিউট সহ 56টি গবেষণা ব্যুরো রয়েছে। 20টি আবাসিক হল, 3টি ছাত্রাবাস, 7টি স্নাতক পর্যায়ের অভিভুক্ত সরকারি কলেজসহ 105টি অধিভূক্ত কলেজ রয়েছে। এখানকার অসংখ্য কৃতি শিক্ষার্থীর মধ্যে 13 জন রাষ্ট্রপতি, 7 জন প্রধানমন্ত্রী এবং একজন নোবেলপুরস্কার বিজয়ী হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় লাইব্রেরী। এতবড় একটা নামি-দামি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে না জানলে কী আর হয়? তাই খুব সংক্ষিপ্ত আকারে আজ আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আলোচনা করবো। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রতিষ্ঠা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হয় মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকালে স্বাধীন জাতিসত্ত্বার বিকাশকে লক্ষ্য রেখে। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ 1912 সালের 2 ফেব্রুয়ারী এটি প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন। শুরুতের প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন ধরণের প্রতিকূলতার মুখে পড়ে। তাছাড়া 1914 সালে বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। 

অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে অবশেষে 1921 সালের 1 জুলাই কলা, বিজ্ঞান এবং আইন- এই তিনটি অনুষদ এবং মাত্র 60 জন শিক্ষক নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরু করে। 1952 সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে 1971 সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবময় ভূমিকা। তাছাড়া বিভিন্ন সময়ে দেশের ক্রান্তিকালে এই প্রতিষ্ঠানের মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। 

মূল প্রাঙ্গন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গন প্রায় 600 একর জায়গার উপর অবস্থিত। বিভিন্ন অনুষদ, বিভাগ, আবাসিক হল ও অন্যান্য অবকাঠামোগুলো এই এলাকার মধ্যে অবস্থিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীকী ভবনগুলোর মধ্যে কার্জন হল এবং কলা ভবন অন্যতম। 

কার্জন হলে বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়সমূহ এবং কলা ভবনে কলা বিভাগ ও সমাজবিজ্ঞানের কয়েকটি বিষয়ের পাঠদান ও পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। সামাজিক বিজ্ঞান ভবনে সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগসমূহ, ব্যবসায় শিক্ষা ভবন ও এমবিএ ভবনে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগসমূহের পাঠদান ও পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া চারুকলা ভবনে চারুকলা বিভাগসমূহের প্রয়োজনীয় পাঠদান ও পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। 

ভর্তি

এই বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে ভর্তি হওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষ কর্তৃক গৃহীত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ভর্তি হতে হয়। মোট পাঁচটি ইউনিটে ভাগ করে পরীক্ষাগুলো নেওয়া হয়ে থাকে। বিজ্ঞান অনুষদের জন্য ’ক’ ইউনিট, মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের জন্য ‘খ’ ইউনিট, ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের জন্য ‘গ’ ইউনিটে পরীক্ষা গুলোকে ভাগ করা হয়। তাছাড়া বিষয় পরিবর্তনের জন্য ’ঘ’ ইউনিট এবং চারুকলা অনুষদের জন্য ‘চ’ ইউনিটে পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়। 

ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের যোগ্যতা হিসাবে একজন শিক্ষার্থীর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক উভয় পরীক্ষার ফলাফলকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ক ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য উভয় পরীক্ষায় মোট জিপিএ 8.5 এবং আলাদাভাবে ন্যূনতম 3.5 থাকতে হবে। খ এবং গ ইউনিটের জন্য মোট জিপিএ 8.0 এবং আলাদাভাবে ন্যূনতম 3.5 থাকতে হবে। খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এর সকল তথ্য!

ঘ ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান শাখার মোট জিপিএ 8.0 এবং আলাদাভাবে ন্যূনতম 3.0 থাকতে হবে, মানবিক ও বাণিজ্য শাখার ক্ষেত্রে মোট জিপিএ 7.0 এবং আলাদাভাবে ন্যূনতম 3.0 থাকতে হবে। চ ইউনিটে ভর্তির জন্য মোট জিপিএ 7.0 ন্যূনতম এবং আবং আলাদাভাবে ন্যূনতম 3.0 থাকতে হবে। ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরে আসন সংখ্যার উপর ভিত্তি করে শিক্ষার্থীরা তাদের পরীক্ষার ফলাফল ও পছন্দ অনুযায়ী বিষয় নির্বাচন করতে পারে। 

এখানে ক্লিক করেঃ- শিশুদের নামের সকল তথ্য জানুন!

শিক্ষাবর্ষ ও শিক্ষাদান প্রক্রিয়া

এই বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে চার বছর এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ে এক বছর মেয়াদী শিক্ষাদান করা হয়। বেশিরভাগ বিভাগেই শিক্ষাবর্ষগুলো দুটি সেমিস্টারে বিভক্ত, যেখানে জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত প্রথম সেমিস্টার এবং জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কে দ্বিতীয় সেমিস্টার হিসাবে নির্ধারিত করা হয়। প্রতি সেমিস্টারে দুইটি মধ্যবর্তী এবং একটি চুড়ান্ত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া অন্যান্য বিভাগগুলোতে একটি বার্ষিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এই বিভাগগুলোতে বিভিন্ন সময়ে টিউটোরিয়াল নেওয়া হয়। 

বিজ্ঞান অনুষদের বিভাগগুলোতে শিক্ষার্থীদেরকে প্রতি সেমিস্টারে বা শিক্ষাবর্ষে এক বা একাধিক অ্যাসাইনমেন্ট করতে হয়। অধ্যাপকবৃন্দ পাঠদানের অংশথেকে কোন নির্দিষ্ট বিষয়ে এই অ্যাসাইনমেন্ট প্রদান করে থাকেন। এছাড়াও প্রয়োজন অনুসারে গবেষণাগার কার্যক্রম অন্তর্ভূক্ত থাকে। শেষ শিক্ষাবর্ষে কোন একজন তত্ত্বাবধায়ক শিক্ষকের অধীনে একটি সন্দর্ভ লিখে বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দিতে হয়। 

আবাসিক হলসমূহ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর সমস্ত ছাত্র-ছাত্রীকে কোন না কোন হলের সাথে আবাসিক বা অনাবাসিক যে কোনভাবে যুক্ত থাকতে হয়। বর্তমানে এখানে ছেলেদের জন্য 14টি এবং মেয়েদের জন্য 5টি আবাসিক হল রয়েছে। হলগুলো নিম্নরূপঃ

  1. সলিমুল্লাহ মুসলিম হল
  2. ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ হল
  3. জগন্নাথ হল
  4. ফজলুল হক মুসলিম হল
  5. শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল
  6. রোকেয়া হল
  7. মাস্টারদা সূর্যসেন হল
  8. হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল
  9. শামুসন নাহার হল
  10. কবি জসীম উদ্দীন হল
  11. স্যার এ.এফ রহমান হল
  12. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল
  13. মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল
  14. বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল
  15. নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী ছাত্রী নিবাস
  16. অমর একুশে হল
  17. বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল
  18. বিজয় একাত্তর হল
  19. কবি সুফিয়া কামাল হল

এছাড়া ব্যবসায়ে প্রশাসন বা আইবি এর ছাত্রদের জন্য আই.বি.এ হোস্টেল রাজধানীল ফার্মগেট এলাকায় অবস্থিত। রাজধানীর হাজারীবাগে ইনিস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি এর ছাত্রদের জন্য ডঃ কুদরত-ই-খুদা ছাত্রাবাস রয়েছে। এছাড়াও স্যার ফিলিপ হার্টগ ইন্টারন্যাশনাল হল নামে একটি আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাস রয়েছে।

বৃত্তি/আর্থিক সহায়তা

পড়াশোনার উন্নতি এবং আনুসঙ্গিক প্রয়োজনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও আর্থিক সাহায্য প্রদান করে থাকে। স্নাতক পর্যায়ে সর্বোচ্চ নাম্বার প্রাপ্ত শিক্ষার্থীকে কালিনারায়ন বৃত্তি প্রদান করা হয়, যা ভাওয়ালের রাজা রাজেন্দ্র নারায়ন তার পিতা কালিনারায়নের স্মরণার্থে চালু করেন। পরীক্ষার ফলাফলের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন অনুষদ ভিত্তিক বিভিন্ন বিভাগে অধ্যায়নরত শিক্ষার্থীদের মেধা ‍বৃত্তি ও সাধারন বৃত্তি প্রদান করা হয়। স্নাতক পর্যায়ে কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলের জন্য নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য শিক্ষাবিদ ও অন্যান্য ব্যক্তিদের স্মরণার্থে বিভিন্ন বৃত্তি প্রদান করা হয়। 

বিভিন্ন সংগঠক ও প্রতিষ্ঠান স্নাতক পর্যায়ের ছাত্র-ছাত্রীদেরকে বিভিন্ন ধরণের বৃত্তি প্রদান করে থাকে। অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন মেধাবী শিক্ষার্থী যারা স্নাতক অধ্যায়নরত, তাদেরকে বৃত্তি প্রদান করে। জাপানের সুমিতমো কর্পোরেশন এশিয়া এন্ড ওসিনিয়া প্রাইভেট লিমিটেড কর্তৃপক্ষ 2021 সাল থেকে  স্নাতক পর্যায়ের নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে চার বছর মেয়াদী বৃত্তি চালু করেছে। ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদভুক্ত বিভিন্ন বিভাগের 25 ছাত্রীকে ফার গ্রুপ এবং রয়েল টিউলিপ সি পার্ল বিচ রিসোর্ট এন্ড স্পার বৃত্তি প্রদানের জন্য অনুমোদন প্রদান করে। 

ভাস্কর্য ও স্মৃতিস্তম্ভ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ কিছু ভাস্কর্য ও স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে যার মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়স্থ ঢাকা মেডিকেল কলেজের পাশে অবস্থিত 1952 সালের ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিসৌধ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার অন্যতম। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মারক হিসাবে অনেকগুলো ভাস্কর্য রয়েছে। অপরাজেয় বাংলা ভাস্কর্যটি স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম স্মারক ভাস্কর্য যা কলাভবনের সামনে অবস্থিত। 

1988 সালের 25শে মার্চ টিএসসি এর সড়কদ্বীপে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে নির্মিত স্বোপার্জিত স্বাধীনতা ভাস্কর্যটির নির্মানকাজ শেষ হয়। স্বাধীনতা সংগ্রাম ভাস্কর্যটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভাস্কর্য যা ফুলার রোডে সলিমুল্লাহ হল, জগন্নাথ হল ও বুয়েট সংলগ্ন সড়ক দ্বীপে অবস্থিত। এটি ভাষা আন্দোলন এবং স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত ইতিহাসের সমস্ত বীরত্বগাথাকে ধারণ করে। এছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আরো অনেক ভাস্কর্য রয়েছে। 

উপসংহার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করা অনেক ছাত্র-ছাত্রীদের স্বপ্ন। এই প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত অনেক গবেষক, বিজ্ঞানি, প্রকৌশলী, রাজনীতিবীদ এবং কবি-সাহিত্যিক উপহার দিয়েছে। আমরা আশা করি প্রতিষ্ঠানটি তার ঐতিহ্য ধরে রেখে ভবিষ্যতে আমাদেরকে আরো অনেক সফল ব্যক্তিত্ব উপহার দিবে যারা দেশকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিবে এবং বিশ্বের শ্রেষ্ট দেশগুলোর সারিতে পৌছে দিবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট

ট্যাগঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক ইউনিট বিষয়সমূহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কত সালে প্রতিষ্ঠিত হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঘ ইউনিট বিষয়সমূহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি যোগ্যতা ২০২১-২০২২

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *