উসমানীয় সম্রাজ্যের ইতিহাস

উসমানীয় সম্রাজ্যের সঠিক ইতিহাস জেনে নিন!

১২৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত উসমানীয় সম্রাজ্য প্রায় ৬২৩ বছর ধরে গৌরবের সাথে বিশ্ব শাসন করেছিল। সেই সম্রাজ্যের অজানা অনেক ইতিহাস আজ তুলে ধরব আপনাদের সামনে। তাহলে আর দেরি কেন, চলুন জেনে নিই উসমানীয় সম্রাজ্যের ইতিহাস এবং সেই সম্রাজ্যের অজানা অনেক কিছু।

উসমানীয় সম্রাজ্যের ইতিহাস

অটোমান সাম্রাজ্যের অভ্যুদয় 

১২৯৯ সালে অভ্যুদয় হয় অটোমান সাম্রাজ্যের। এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপ এই তিনটি মহাদেশ জুড়ে বিস্তৃত ছিল উসমানীয় বা অটোমান সাম্রাজ্য। দীর্ঘ ৬শ বছর এর বেশি সময় ধরে স্থায়িত্ব ছিলো এই সম্রাজ্যের। এই সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিনেন তুর্কি বংশোদ্ভূত ওসমান গাজী, যিনি প্রথম ওসমান হিসেবে অধিক পরিচিত। এই কারণেই মূলত এই সম্রাজ্য কে ‘উসমানীয় সাম্রাজ্য’ বলা হয়। বিশাল এই সাম্রাজ্যের সীমানা কতটুক ছিলো তা শুনলে হয়তো অবাক হয়ে যাবেন। উত্তর আফ্রিকার তিউনিসিয়া থেকে শুরু করে ইউরোপের হাঙ্গেরী, রাশিয়ার ক্রিমিয়া থেকে পূর্বে জর্জিয়া এবং জর্জিয়া থেকে দক্ষিণে আরবের ইয়েমেন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এই সম্রাজ্য।

প্রতিষ্ঠাতা প্রথম উসমান

উসমানীয় সম্রাজ্যের ইতিহাস এর কথা বললেই প্রথমে যার কথা আসে তিনি হলেন উসমান গাজী। এবার চলুন জেনে নেয়া যাক এই রাজবংশের বা সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সেই উসমান গাজী সম্পর্কে। উসমান গাজী মূলত প্রথম উসমান নামেই সমাধিক পরিচিত ছিলেন। তার নামেই অটোমান বা উসমানীয় সাম্রাজ্যের নামকরণ করা হয়েছে। ১২৯৯ সালে তুর্কি বংশোদ্ভূত প্রথম উসমান বা উসমান গাজী সেলযুক সাম্রাজ্য কর্তৃক উত্তরপশ্চিম আনাতোলিয়ার দ্বায়িত্ব পান।

শুরুর দিকে সেলযুক সাম্রাজ্যের প্রতি অনুগত থাকলেও সেলজুক সাম্রাজ্যের শেষ সময়ে উসমান গাজী স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এভাবে ধীরে ধীরে উসমানীয় সামাজ্যের গোড়াপত্তন হয়। উসমান গাজী মূলত সেলজুক রাজবংশের জামাতাও ছিলেন। তার মা এবং হালিমে সুলতান ছিলেন সেলজুক শাহজাদা নুমান এর মেয়ে। 

১২৯৯ সালে যখন মোঙ্গল সাম্রাজ্যে উসমান গাজী বার্ষিক কর পাঠালেন না মূলত তখন থেকেই প্রতীকী অর্থে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। ১৩০০ সাল থেকেই তিনি একে একে বিভিন্ন অঞ্চল জয় করতে থাকেন। নবগঠিত অটোমান রাজ্যের রাজধানী হিসেবে তিনি বেছে নেন ইয়েনিশেহিরক শহরকে। 

১৩২১ থেকে ১৩২৬ সাল পর্যন্ত উসমানের বাহিনী মুদান্‌য়া বন্দর ও বার্সার মতো গুরুত্বপূর্ণ শহর দখল করে নেন। বার্সা জয় ছিলো উসমানীয় সাম্রাজ্যের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। ইতিপূর্বে উসমান গাজী নানা যুদ্ধে কেবল বর্বর জাতিদেরর বিরুদ্ধে জয় পেয়েছিলেন। কিন্তু এবারই প্রথম তিনি এমন এক শহরের দখল নিলেন যা ছিলো তখনকার যুগে এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক কেন্দ্র। মূলত এই জয়ের মাধ্যমেই মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব ইউরোপে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মানচিত্রের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠে উসমানীয়রা।

এই জয়ের কিছু সময় পরে বয়সের ভারে ন্যুজ হয়ে পড়েন উসমান গাজী। তখন তার অসামাপ্ত কাজ সম্পাদনের ভার পরে বড় ছেলে ওরহান গাজীর হাতে। তিনি ছিলেন তৎকালীন সময়ে উসমানীয় বেয়লিক নামে পরিচিত উদীয়মান উসমানীয় সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় বে।

ওরহান গাজীর পর একে একে ক্ষমতায় আসেন সুলতান প্রথম মুরাদ , প্রথম বায়েজিদ, প্রথম মুহাম্মদ), দ্বিতীয় মুরাদ , দ্বিতীয় মুহাম্মদ এবং দ্বিতীয় মুরাদ। প্রসঙ্গত এখানে উল্লেখ্য যে, ১৪৫৩ সালে সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ কনস্টান্টিনোপল জয় করেন। এই জয়ের মাধ্যমে অটোমানরা সুদীর্ঘ কাল ধরে রাজত্ব করে আসা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য উচ্ছেদ করেন। 

উসমানীয় সাম্রাজ্যের সফলতার সর্বোচ্চ পর্যায়

উসমানীয় সাম্রাজ্য বিস্তৃতির যুগে প্রবেশ করে ১৫শ ও ১৬শ শতাব্দীতে। উসমানীয় সম্রাজ্যের ইতিহাস কে এই সময় টা অনেক সমৃদ্ধ করে। এসময় নিবেদিত ও দক্ষ সুলতানদের শাসনের ধারাবাহিকতায় সাম্রাজ্য সমৃদ্ধি লাভ করে। ইউরোপ এবং এশিয়ার মধ্যকার বাণিজ্য রুটের বিস্তৃত অংশ নিয়ন্ত্রণ করার কারণে এই সাম্রাজ্য ব্যাপকভাবে অর্থনৈতিক উন্নতি লাভ করে।

সুলতান প্রথম সেলিম পারস্যের সাফাভি সম্রাট প্রথম ইসমাইলকে পরাজিত করে দক্ষিণ ও পূর্ব দিকে সাম্রাজ্যের সীমানা বিস্তৃত করেন। শুধু তাই না সুলতান প্রথম সেলিম মিশরে উসমানীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করেন এবং লোহিত সাগরে নৌবাহিনী মোতায়েন করেছিলেন। 

সুলতান সুলাইমান ও উসমানীয় সাম্রাজ্য

উসমানীয় সাম্রাজ্য তার সর্বোচ্চ সফলতায় পৌছে সুলতান সুলাইমান ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে। যুবরাজ থাকাকালেই তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। সেই সময় থেকেই তাঁর সততা ও যোগ্যতার কথা সবখানে আলোচিত হত। তিনি খলিফা হওয়ার পর সারা দেশে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। সুলতান সুলাইমান ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান মুসলিম। দৈনন্দিন জীবনে তিনি ইসলামের অনুশাসনগুলো নিষ্ঠার সাথে পালন করতেন। সকল মুসলিম নাগরিক যাতে নিয়মিত নামাজ ও রোজা পালন করে সেই দিকে তাঁর সজাগ দৃষ্টি ছিল। নামাজ ও রোজা পালনে কেউ অলসতা দেখালে তাদের জন্য ছিল শাস্তির ব্যবস্থা ।

তিনি অন্যান্য ধর্মানুসারীদের প্রতি ও উদার মনোভাব পোষণ করতেন। ইতিহাসবিদ লর্ড ক্রেজি বলেন, রোমান ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্টদের অত্যাচার-অবিচারের যুগে সমসাময়িক অন্যকোন নরপতি সুলতান সুলাইমানের মত প্রশংসা অর্জন করতে পারেননি”। সুলতান সুলাইমানের সাহসিকতা, মহানুভবতা, ন্যাপরায়ণতা ছিল তার চরিত্রের অন্যতম ভূষণ। সুলতান সুলাইমান নাগরিকদের করভার লাঘব করেন। তিনি পবিত্র আল কুরআনের আটটি খন্ড নিজের হাতে কপি করে সুলাইমানিয়া মসজিদে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন। তাছাড়া ও সুলতান সুলাইমান পবিত্র কাবা ঘর ও সংস্কার করেন। সুলতান সুলাইমান এর  শাসনকালে ধর্মীয় কোন্দলের কারণে বিপদাপন্ন হয়ে বিভিন্ন দেশ থেকে যখন খ্রিস্টান প্রোটেস্ট্যান্ট ও ক্যাথলিক তাঁর রাজ্যে আসেন তখন তিনি তাদেরকে নিরাপদ আশ্রয় দেন এবং তারা এখানে এসে নিরাপদে বসবাস করতে থাকে। 

১৫২১ সালে সুলতান সুলাইমান বেলগ্রেড জয় করেন। ১৫২৯ সালে তিনি ভিয়েনা অবরোধ করেন তবে এই শহর তিনি জয় করতে ব্যর্থ হন। ১৫৩২ সালে তিনি পুনরায় ভিয়েনা আক্রমণ করলে ও গুনসের অবরোধের পর তিনি ফের ব্যর্থ হন। অটোমান শাসক সুলতান সুলাইমানের শাসনের সমাপ্ত হওয়ার সময়  এই সাম্রাজ্যের মোট জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৫,০০০,০০০ এবং অবাক করার মত বিষয় হচ্ছে এই সম্রাজ্য তিন মহাদেশব্যপী বিস্তৃত ছিল। উসমানীয় সম্রজ্যের আরেকটি অর্জন ছিল একটি শক্তিশালী নৌ শক্তি গঠন। সেসময় ভূমধ্যসাগরের অধিকাংশ এলাকা উসমানীয়রা নিয়ন্ত্রণ করত। 

উসমানীয় সম্রাজ্যের পতনের শুরু

উসমানীয় সম্রাজ্য সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে সুলতান আবদুল হামিদ এর সময়ে এসে। ৩৪ বছর বয়সী আব্দুল হামিদ যখন মসনদে বসছিলেন তখন চারপাশে কট্টর ইহুদিবাদী ফ্রি-মিশন ও নব্য তুর্কিদের ছিল একক প্রাধান্য। ভারতীয় উপমহাদেশ সহ আরো অনেক মুসলিমপ্রধান অঞ্চলে তখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠে উপনিবেশিক ইহুদিবাদি শক্তি। সুলতান আব্দুল হামিদ তার শাসনামলের শুরুতে ইউরোপিয় চিন্তাধারার নব্য তুর্কি জাতীয়তাবাদী মতবাদের সম্মুখিন হন। তুর্কি জাতিয়তাবাদী আন্দোলন উসমানীয় সম্রাজ্যে কে প্রায় প্রাণশূণ্য করে ফেলছিল। উল্লেখ্য এই চিন্তাধারার উৎপত্তি ও পরবর্তীতে বিস্তারকারীরা ছিল ইহুদিবাদী থিওডোর হের্জল। তিনি ইহুটিরাষ্ট্র ইজরাইলের জনক। 

থিওডোর হের্জল এর নেতৃত্বে ইহুদিরা যে কোন মূল্যে ফিলিস্তিনে তাদের একটি রাষ্ট্র স্থাপনে মরিয়া ছিল। সেক্ষেত্রে সুলতান আব্দুল হামিদই ছিলেন তাদের প্রধান বাধা। ইহুদিরা ফিলিস্তিনে তাদের জাতীয় নিবাস স্থাপনের শর্তে উসমানীয় সম্রাজ্যের সকল ঋণ পরিশোধের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু সুলতান আবদুল হামিদ তা অত্যন্ত ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। শুধু তাইনা ইহুদিরা বায়তুল মুকাদ্দাস হস্তান্তরের জন্য ১৫০ মিলিয়ন পাউন্ড দিতে চেয়েছিল কিন্তু তিনি মুসলিম বিশ্বের একচুল মাটি ছাড়তেও রাজি হননি! এই পরিস্থিতিতে  তারা অনুধাবন করতে থাকে সুলতান আবদুল হামিদ ই ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রধান বাধা। তাই ইহুদিরা শুরু করে সুলতানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র।

উসমানীয় সম্রাজ্যের পতন

১৯০৬ সালে বিশ্বাসঘাতক আনোয়ার পাশা, তালাত পাশা ও জামাল পাশা ভিতরে ভিতরে সেনাবাহিনীর বিরাট একটি অংশকে নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসেন। ৩১শে এপ্রিল ১৯০৯ সালে ইহুদি লবি রাজধানিতে সুলতানের পক্ষে এক প্রতিবিপ্লব ঘটায়। যাতে নব্য তুর্কিদের কয়েক নেতা নিহত হয়। তারপর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে এ সকল কিছুর জন্য সুলতানকে দায়ী করে তাকে অপসারণ করা হয়! 

এই সবকিছুর পেছনে ছিল ইহুদি ফ্রি মিশন,নব্য তুর্কি  জাতীয়তাবাদ ও সুলতানের বিশ্বস্ত কিছু পাশার বিশ্বাসঘাতকতা। সেই রাতেই তাকে স্যালোনিকায় নির্বাসনে পাঠানো হয়। সেখানে তাকে এক ইহুদির বাড়িতে কড়া নজরবন্দির মধ্যে রাখা হয়। এরপর তাকে ইস্তাবুলে এনে বায়লারবি প্রাসাদে রাখা হয়। এখানেই এই মহান সুলতান ২৮ রবিউল আউয়াল ১৩৩৬ হিজরি অর্থাৎ ১০ই ফেব্রুয়ারি ১৯১৮ সালে ৭৬ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। আর এর ফলে ৬শ’ বছরের গৌরবান্বিত উসমানীয় সম্রাজ্যের  পতন  ঘটে।

উসমানীয় সম্রাজ্যের পতনের সুস্পষ্ট কিছু কারণ

 (I) দ্রব্য মূল্যের উর্ধ্বগতি

(II) কৃষিজমির তুলনায় জনসংখ্যার অত্যধিক হার

(III) সুলতানদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও কামুকতা 

(IV) ঘুষ গ্রহনের মাধ্যমেদ অযোগ্য বক্তিদের প্রশাসনিক উচ্চ পর্যায়ে দায়িত্বে  বসানো 

(V) সাম্রাজ্যের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ ছিল অশিক্ষিত। বিশ্ব যতটা আধুনিক হয়েছে অটোমানরা আধুনিক বিশ্ব থেকে ঠিক ততটাই ছিটকে পড়েছিল।

(VI) কৃষি নির্ভর অর্থনীতি 

(VIII)  গণতন্ত্রের উত্থান 

(IX) রাশিয়ার সঙ্গে ধ্বংসাত্মক প্রতিদ্বন্দ্বিতা

(XIII) বিশৃঙ্খল সৈন্যবাহিনী 

(XIV) ব্রিটিশ ষড়যন্ত্র ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়

পনের শতাব্দীতে সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিতে উসমানীয়রা ছিল জগতের শ্রেষ্ঠ। অটোমান সাম্রাজ্যের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী, বিখ্যাত সব স্থাপনা এবং জ্যোতির্বিদ্যার সুদূরপ্রসারী উন্নতি বিশ্বের অন্যসব সম্রাটের ঈর্ষার কারণ ছিল। এত এত সফলতার পর ও বিশ্ব এই সম্রাজ্যের পতন দেখেছিল। 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *